কিছুটা লজ্জা ও সংকোচ নিয়ে ছাত্রীর (আশা মনি) বাসার কলিং বেল চাপলাম। বুকের মধ্যেও ঢিপঢিপ করছে। কিছুক্ষণ আগে ছাত্রী ফোন করে পড়াতে আসতে বলেছে। তাদের বাসায় নাকি মেহমান গিজগিজ করছে। তার বড় ফুপিমা ১০ বছর পর পুরো পরিবার নিয়ে মালয়শিয়া থেকে দেশে বেড়াতে এসেছেন। তারা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা।
আগেও ছাত্রীর মুখে ফুপিমার পরিবার সম্পর্কে শুনেছি। আজ সেই পুরো পরিবারকে দেখতে পাবো। ভাবতেই মনের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা কাজ করছিলো। যদিও ছাত্রীর মুখে শুনেছি যে, তার ফুপিমা আমাকে টিউটর হিসেবে পছন্দ করেন না। অবশ্য কারণটা আমি কখনোই জানতে চাইনি।
৩য় বার কলিং বেল চাপার পর আনুমানিক অষ্টাদশী এক রমণী দরজা খুলে দিলো। আমি অপলক দৃষ্টিতে অপরিচিতা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ''আপনি আমার আপুনীর (ফুফাতো বোন) দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন কেন?'' ছাত্রীর এমন চিৎকারে আমার ঘোর কাটলো। আমার থতমত অবস্থা দেখে রুমের সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। লজ্জায় মাথা নিচু করে ছাত্রীকে পড়ানোর রুমে চলে গেলাম।
১০ মিনিট পরে ছাত্রীর ফুপিমা রুমে প্রবেশ করলেন। আলাপচারিতার শেষে তিনি আমাকে বললেন,
>তোমাকে টিউটর হিসেবে খুবই পছন্দ হয়েছে। আসলে ভাবীর (ছাত্রীর মা) কাছে শুনেছি তোমার কোনো 'Imo Account' নেই। যা এ যুগের ছেলেদের সাথে যায় না। তুমি তো স্মার্ট, মার্জিত ও আধুনিকমনা। ফলে তোমার উপর আমি কিছুটা নাখোশ।
আসলে আমার ইমু আইডি আছে। কিন্তু ছাত্রীর বেশিরভাগ রিলেটিভ বিদেশে থাকেন বলে আন্টিকে ইমু আইডির কথা বলিনি।
১ ঘন্টা পড়ানো শেষে ছাত্রীর ফুফা রুমে প্রবেশ করলেন। আমার যথেষ্ট প্রশংসা করে তিনিও আমাকে ইমু আইডি খোলার বিষয়ে জোর তাগাদা দিলেন।
পড়ানোর শেষ পর্যায়ে সেই অষ্টাদশী খালি ট্রে হাতে নিয়ে পড়ানোর রুমে প্রবেশ করলো। আমাকে উদ্দেশ্য করে ছাত্রীকে বললো,
>তোমার শিক্ষকের ইমু আইডি নেই। ক্ষ্যাত কোথাকার। তোমার টিউটর সনাতন ভাবধারা থেকে বের হতে পারেননি। তাই আজকের রাজকীয় নাস্তা আমরাই কাজিনরা মিলে সাবাড় করে ফেলেছি। এটাই তার শাস্তি।
পুরো বিষয়টির মধ্যে আমি 'Something Something' এর গন্ধ পেলাম। এ সুযোগ যেন হাত ছাড়া করার উপায় নেই। 'আমি যে তোমারই প্রেমেতে পড়েছি' শাকিব খান-সাহারার গানটি গুনগুনিয়ে গাইলাম। আসলে হবু শ্বাশুড়ি মা (সরি ফুপুমা) যে আমাকে তার হবু জামাই হিসেবে পছন্দ করে রেখেছেন তা আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি। নিজেকে মালয়েশিয়ার নাগরিক মনে হচ্ছে। "অবশেষে আমি যে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলাম" এমন ভাবনায় "মনের মঞ্চে" লুঙ্গি ড্যান্সও করে ফেললাম।
সাদা কাগজে ইমু আইডির নাম্বার লিখে ছাত্রীর মাধ্যমে অষ্টাদশীর হাতে পৌঁছালাম। নিজেকে অষ্টাদশীর হবু বর ভাবতে ভাবতে লজ্জায় মাথা নিচু করে বাসায় ফিরলাম।
১ মাস পরের কথা। অষ্টাদশীর পরিবার মালয়েশিয়া চলে গেলো। যাওয়ার দু'দিন পর ফুপিমা আমাকে ইমুতে ভিডিও কল করলেন। তখন ছাত্রীকে পড়াচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম অষ্টাদশীই হবে। তাই চিরুনি দিয়ে মাথা গুছিয়ে নিলাম। কল রিসিভ করতেই ফুপু বললেনঃ
>দেখো বাবা, ভাবীর (ছাত্রীর মা) ফোনে বেশিরভাগ সময় এমবি থাকে না। তুমি তো আশাকে দু'ঘন্টা পড়াও। এই দু'ঘন্টায় মাঝে মাঝে মায়ের (ছাত্রীর দাদী) সাথে কথা বলতে পারবো। তাই তোমার ইমু নাম্বারটা এনেছি। কিছু মনে করো না।
আমি কিছু মনে করিনি। প্রতিদিনই পড়ানোর সময় ফুপু কল করেন। আমি রিসিভ করে আন্টিকে দেই। আজ পর্যন্ত ভিডিও কলে অষ্টাদশীর ছায়াও দেখলাম না। বরং আমার টাকা, এমবি, মোবাইল ও ব্যাটারীর আয়ু কমে যাচ্ছে। ইদানীং অন্য রিলেটিভরাও কল করেন। দু'ঘন্টার জায়গায় মোবাইল হাতে পেতে চার ঘন্টা সময়ও লাগে। আন্টি নাস্তা দিতেও ভুলে গেছেন। ভাবছি টিউশনিটা ছেড়ে দিবো। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাকে গুলিস্তানের মোড়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে হবে। তাছাড়া এতো বড় সুযোগ পেয়েও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে থেকে যাওয়াটাই হবে জ্বলন্ত দেশপ্রেমের উদাহরণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মালয়েশিয়ার গুষ্ঠি কিলাই। যদিও নিন্দুকেরা বলবেন, 'আঙ্গুর ফল টক'!
গল্পঃ ইমু আইডি বিড়ম্বনা
# Anik Ahamed






No comments:
Post a Comment