একটি পাকনি বুড়ির গল্প
লিখাঃ- Bablu Ahmed Robin
আমাদের পরিবারটি যৌথ পরিবার। এখানে আব্বু চাচ্চুরা তিন ভাই। তিন জনের পরিবারের সদস্য সংখ্যা এখন বিশ প্লাস। আমরা যৌথভাবে বসবাস করে আসতেছি প্রায় ত্রিশ বছরেরও বেশি। এই পরিবারটাই ছিলো আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে আমি আমার জীবনের সেরা শিক্ষাগুলো অর্জন করতে পেরেছি।
-
এ পরিবারটাই আমার ভালোবাসা। আমাদের পরিবারে যে যে ব্যাপারগুলো প্রায়শই ঘটমান তা হলো খাবারের সময় ছোটখাটো একটা সেলিব্রেশন হয়ে যায়। আর সব ভাইবোন পড়াশোনায় বসলেও এমনটাই মনে হবে। হই হুল্লোড় শুনে যে কেউ বাহির থেকে আন্দাজ করতে পারবেনা ভেতরে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে, নাকি পড়াশোনা হচ্ছে, নাকি মাছ বাজারে পুরোদস্তুর দর কষাকষি চলছে।
.
আমরা ভাইবোনরা যখন ডাইনিং টেবিলে বসি তখন সবারই উইশ থাকে বড় মাছের মাথাটা যেনো তার পাতে চলে আসে। আমি বাড়ির বাইরে পড়াশোনা করার সুবাদে বাড়িতে গেলে দেখা যেতো প্রায়ই মাছের মাথা আমার পাতে চলে এসেছে। এতে করে সবার আফসুস চুপসে যাওয়া মুখটা খুব পানসে লাগতো আমার কাছে। তখনি এটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে সবার পাতে বিলি করতাম। এখানে মজার ব্যাপার হলো তখন সবার মাছের অর্ধেক পিস আমার পাতে আসতে শুরু করে।
-
তারপর আম্মা চাচীরা খাবারের কিছু একটা বানাইলো, সবাইকে একটা ডাক দেয়ার সাথে সাথেই সেটা এক থাবায় সব ভাইবোন মিলে এসে সাবার করে ফেলতাম। এইযে সুখ এইযে বিনিময় প্রথা এই যে ভালোবাসা সেটা সারাজীবন বিরাজমান যেনো থাকে এই দোয়াটাই আমি সবসময় করি।
.
আরেকটা বিষয় ঘটে থাকে সেটা হলো চিন্তাভাবনা কারো একক থাকেনা সবটাই কম্বাইনড। কেউ একজন পড়ে গিয়ে উফ বলে শব্দ বের করার সাথে সাথেই সবাই দৌড়ে, উড়ে চলে আসবে।
"দেখি দেখি ক্যামনে কি হলো?" "ওই আমাকে দেখতে দে, না না দাড়া আমি দেখি, দেখে চলা যায়না নাকি? আহারে! এইটা আনো, ওইটা আনো, এইটা লাগাও ওইটা লাগাও।"
তখন আপনার ব্যাথা ভুলে যাবেন, কারন ব্যাথা সবাই ভাগ করে নিয়ে গিয়েছে। আমি একবার বাইক এক্সিডেন্ট করেছিলাম। খুব মেজর ফ্যাক্ট ছিলোনা। হাত পা ছিলে ছিলো। তাও মরা বাড়ি ভেবে অনেকেই রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িতে আইসা ওকি দিয়ে গিয়েছিলো। এতো কান্নাকাটি শুরু করেছিলো সবাই। আমি ব্যাথা ভুলে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।
.
আরেকবার এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেয়েছিলাম। সবাই এতো নাচানাচি আর এতো খুশি হয়েছিলো আমি নিজেই কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, আজ কার রেজাল্ট দিয়েছে?
মোটামুটি একটা বিয়ের খাবারের আয়োজনও হয়ে গিয়েছিলো সেদিন।
-
একবার আমাকে নিয়ে সবার স্বপ্ন জানতে চাওয়া হয়েছিলো। তো মনে করেন দুই একটা ছোট খাটো পোস্টের চাকুরিজীবী বাদে আমি বাকি সবটা হওয়ার স্বপ্ন'ই তখন বসে বসে দেখে ফেলেছিলাম। এখনো আমি নিজেই জানিনা আমি কি হবো? তবে কিছু একটা হলে যে কোন একজনের ইচ্ছা পূরন হয়ে যাবে, এটা প্লাস পয়েন্ট। এটাই হয় এই পরিবারে। একের দুঃখে সবাই দুঃখি একের সুখে সবাই খুশি। আমরা এভাবেই বড় হচ্ছি। এ পরিবারটা একটা স্বর্গ।
.
আমাদের আপন ভাইবোনদের নামের কোন মিল নেই। এর কারন হলো, ধরেন বড় চাচ্চুর একটা মেয়ে তার নাম হাবিবা পরে আমার একটা বোন হয়েছে তার নাম লাবিবা। আবার ছোট চাচ্চুর ছেলে হলো তার নাম লাবিন। আবার বড় চাচ্চুর ছেলের নাম শাফিন। আবার আমার নাম রবিন। নামের মিল খুঁজলে আমাদের সব ভাইবোনকে এক করেন তারপর বড় থেকে ছোট আকারে সাজান তারপর এক এক করে নাম জিজ্ঞেস করেন, যদু মধু রাম সাম সব কাটায় কাটায় মিলে যাবে। ঠিক এই ট্রিকস্ এর কারনেই হয়তো আজ অবধি ভাইবোনের মধ্যে কোন বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়নি। আমরা ভাইবোন, কার পেট থেকে বের হলাম ডাজন্ট ফ্যাক্ট।
.
আমাদের বাড়িতে যখন কোন অনুষ্ঠান হয় তখন আমরা আমরাই মনে করেন বিশাল একটা ব্যাপার স্যাপার হয়ে যায়। আমার বড় ফুপ্পির ঘরে মাত্র তেরো জন ভাইবোন আবার ওই ভাই বোনদের জামাই, বউ বাচ্চাকাচ্চা টাচ্চা মিলে মনে করেন ষাট জন হবে। পরের ফুপ্পিদের লিষ্ট বললে আপনারা শিওর, ট্যাক্স জারি করার পাঁয়তারা করবেন কিংবা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে আন্দোলনে নেমে যাবেন।
-
আমরা সবাই এক হলে সবার মনের কথা শেয়ার করার জন্য কিংবা আড্ডা দেয়ার জন্য একটা বাংলো ঘর আছে। হল রুমের মতো বড় স্পেস, ওখানে গিয়ে বসি। গল্প করতে করতে মনে করেন রাত পেরিয়ে ভোর কখন হয় কেউ টের পায়না। আবার কখনো কখনো সোফা, টেবিল, ফ্লোর ওসব থেকে হামি ফেলে শরীর টানা দিয়ে যখন দেখি ভোর হয়ে গেছে তখন মনে হয়, "হায় হায় ঘুমিয়ে পড়ছিলাম নাকি?"
কত রং, কত ঢং আর কত মজা তা বললে ইতিহাস শেষ হবেনা।
.
এতক্ষণ যা বলছিলাম, উপরের প্রত্যেকটা ছোটখাটো অংশ আমার ডায়েরীতে লিখা ছিলো। আজকে ডায়েরীটা পড়ছিলাম। এর একটা বিশেষ কারনও আছে। ডায়েরীর একেকটা পৃষ্ঠা একেকটা কল্পনার ভিডিও ক্লিপস। এখন যে পৃষ্ঠায় আছি সেখানে একটি পাকনি বুড়িকে নিয়ে লিখা। পাকনি বুড়িটার নাম আন্নি। বুড়িটার গল্প শোনাতেই উপরের অংশের শেয়ার। আন্নি ছিলো বড় চাচ্চুর মেয়ে।
.
আন্নি আমাদের ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। এটাকে বলের মতো করে লোফালুফি করতাম আমরা সবাই। মাটি ছুঁতে দিতামনা। এতো মিষ্টি আর এতো কিউট ছিলো তা আজো মনে গাথা। আর ওই বুড়িটাই আমার সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলো। আমরা যখন খেতে বসতাম আন্নিকে ডাইনিং টেবিলের উপরে বসাতাম। চেয়ারে বসালে টেবিলের তলায় ঢুকে যেতো। সবাই ওরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তুলে তুলে খাইয়ে দিতাম। আমাকে পিচ্চি বুড়িটা 'ববভাইয়া' বলে ডাকতো। ববভাইয়া মানে বুঝেন? বড় ভাইয়া আরকি।
আমার কাধে করে সারা এলাকায় ওরে নিয়ে ঘুরতাম আমি। বিশেষ করে আমার প্রতি বেশি টান ছিলো ওর। তখন আমি স্কুলে পড়ি। আমি বাজারে লুকিয়ে যেতাম তা না হলে আমার পিছু নিবেই নিবে। যখন চাচা চাচী কোথাও বেড়াতে যেতেন তখন ওরে নিতে কী পরিমান বেগ পেতে হতো কি আর বলবো! ও আমার কোলে ওঠে চাচা চাচীকে মানে ওর বাবা মা'কে টাটা দিতো, তার মানে 'তোমরা চলে যাও আমি যাবোনা।'
.
একবার চাচী বাবার বাড়ি যাবে। কোনো ভাবেই এই পিচ্চিটাকে নিতে পারছিলেন না। বুড়িটা আমার শার্ট টেনে ছিঁড়ে ফেলতেছিলো আর বলতেছিলো, "ববভাইয়া আমি যাইতামনা। আমারে তুমি রাখো।"
আমার খুব কষ্ট হয়েছিলো সেবার ওরে দিতে। কেনো জানিনা।
-
চারদিন পর এক সকালে আম্মা উঠানের কোণে অনেক হাড়িপাতিল নিয়ে বসছে ধুইতে। আমি বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করছিলাম, এর আগেরদিন রাতে প্রচুর ঝড় বৃষ্টি হয়েছিলো। ছোট চাচী বারান্দায় কি একটা করছিলো। এমন সময় খবর আসলো কেউ একজন দৌড়ে এসে হাঁপিয়ে বলতেছে, "আপনারা চলেন তাড়াতাড়ি আন্নি মইরা গেছে!"
আম্মার হাত থেকে সেদিনের পাতিল পড়ে যাওয়ার শব্দটা আজো হঠাৎ বজ্রপাতের মতো মনে হয় আমার। ছোট চাচী এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ানো শুরু করলো। সাথে আম্মা, আপু আর সবাই যে যেভাবে ছিলো। তখন আমরা ভাইবোন ছিলাম সাত জন আন্নিকে নিয়ে। আমি ঠায় দাড়িয়ে ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমি কিছু শুনিনি, কিছু হয়নি কিংবা আমি ঘুমে। ঘরে ঢুকে কোনরকম ওয়াল্যাট থেকে একশো টাকা নিয়ে আমিও পিছে দৌড়াচ্ছিলাম। সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম জানে? এগুতে পারছিলামনা। প্রচুর বৃষ্টি শুরু হয়েছিলো। টাউনে কোন গাড়ি পাচ্ছিলাম না। তিন কিলোমিটার দূরে হওয়ায় সবাই দৌড়ে যাচ্ছিলাম। গিয়ে দেখি পিচ্চি বুড়িটা শীতল হয়ে শুয়ে আছে। কোন অসুখ কিংবা কিছুই কেউ টের পায়নি। ঘুমের মধ্যেই চলে গিয়েছিলো।
-
অনেক অভিমান ছিলো হয়তো আমার প্রতি, আমার কলিজা ছিলো বুড়িটা। আমি চিৎকার করে নিজেকে দোষ দিচ্ছিলাম। আল্লাহর কাছে একটা সমঝোতা করতে চেয়েছিলাম, "হে আল্লাহ! এখনো অনেক সময় আছে আপনি টুপ করে আমার জাদুটাকে জাগিয়ে দেন আমি চুপ করে মরে যাবো। আমায় নিয়ে নেন।"
নাহ সমঝোতা আর সেদিন হয়নি।
.
একদিন মাঝ রাতে পিচ্চি বুড়িটা ঘুমাচ্ছিলোনা। চাচী ওরে খুব মারছিলো। আমি দৌড়ে গিয়ে ওরে নিয়ে এসেছিলাম, চাচীকেও বকেছিলাম অনেক। শেষে উঠোনে একটা চেয়ারে ওরে নিয়ে বসে ছিলাম। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ ছিলো সে রাতে। বুড়িটা আকাশের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলছিলো, "ববভাইয়া রুটি অতো দূরে ক্যানো? আমায় এনে দাও আমি খাবো।" মনে মনে আফসোস হচ্ছিল আমার, কি এমন ক্ষতি হতো চাঁদ খাওয়ার সিস্টেমটা চালু থাকলে! আমি হাসতেছিলাম আর বলেছিলাম, "না রে সোনা ওটা রুটি না ওটা চাঁদ মামা। তুমি ঘুমাচ্ছোনা দেখে তোমায় নিয়ে যেতে আসছে।" পিচ্চি বুড়িটা অভিমানের স্বরে আমায় বলেছিলো, "না আমি যাইতামনা চাঁদ মামার সাথে, বলেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরেছিলো। এটাই শেষ শুয়া।
.
ভালোবাসার মানুষগুলোকে উপরওয়ালা নিয়ে নেন। এটা কেনো করেন ওনি? চোখটা মুছে ডায়েরীটা বন্ধ করে ছাদে উঠলাম। আজকেও আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সবাই ভুলে গিয়েছে, সবাই ঘুমে বিভোর। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। একটা মোমবাতি জ্বেলে আর একটা রুটি হাতে আমি একা একা চাঁদটাকে উইশ করছি। আজ বুড়িটার জন্মদিন।
একটি পাকনি বুড়ির গল্প
লিখাঃ- Bablu Ahmed Robin






No comments:
Post a Comment