Joy Bhaiya Youtube Channel

গল্প: করোনার প্রস্থান অতঃপর শেষ_পর্ব

গল্প: করোনার প্রস্থান অতঃপর
শেষ_পর্ব

আমার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। মুখ দিয়ে কথা বের  হচ্ছিল না। চোখের পানিতে স্ক্রিন ভরে যাচ্ছিল।

-আমার জন্য দোয়া করিস ভাই! ভাল করে পড়াশোনা করিস। মা আর বাবাকে দেখেশুনে রাখিস সারাজীবন।

মনে হচ্ছিল যেন স্ক্রিন ভেঙে জড়িয়ে ধরি। হাসপাতাল থেকে ভাইয়ার লাশের কিছু ছবি  পাঠানো হয়েছিল তারপর দিন। তার বেশি আর কিছুই করার ছিল না তাদের। নিজের ভিতরে অপরাধবোধ কাজ করছিল খুব। ইশ্ লাশটা ছুঁয়ে  দেখার সৌভাগ্যও হলো না।

এক কান্না বিজরিত কন্ঠ শুনে চেতনা ফিরে এল আমার।

এই অধমরে সবাই কিছু সাহায্য করেন। দুনিয়ায় আর কিছু নাই আমার। করোনায় সব কাইরা লইয়া গেছে। পেটের দায়ে আত্নসম্মান বেইচ্চা দিছি বাজান। আল্লার দোহাই লাগে। সবাই কিছু দেন। আমার জামাই আছিল শিক্ষক.....

হাতের ইশারায় মহিলাটিকে চুপ করালাম। এসব শুনতে শুনতে ভাল লাগে না আর। পকেট থেকে খুচরা টাকা বের করে এগিয়ে দিলাম। একজনকে দুইটাকার কয়েনও দিতে দেখলাম। প্রোফেশনাল ভিক্ষুক হলে গোলমাল বাধিয়ে বসতো নিশ্চিত।

গাজীপুরার খুব একটা পরিবর্তন নেই। আগের সেই ধূলাবালি একইরকম। বাস থেকে নেমে রিকশা নিলাম। প্রবীণ রিকশাচালক খুব একটা চোখে পড়ছে না। চোখে পড়ছে না নাকি নেই? চেহারায় চুপচাপ আবহাওয়াবিশিষ্ট চালক বেছে নিয়েছি। ভেবেছিলাম নতুন কোন কাহিনী আর শুনতে হবে না।

-আমনের বাড়ি কই মামা?

-এইতো শ্রীপুর।(যথাসম্ভব ছোট উত্তর দেয়ার চেষ্টা)
-আমার বাড়ি অইছে গিয়া মোমেশিং(ময়মনসিংহ)। আমরার বাড়ির দিগে মনে করেন যে না খাইয়াই মারা গেছে......

-মামা সাইড করেন। নামব আমি।

এর থেকে হেটে যাওয়া অনেক ভাল। সত্যিই কি হেটে যাওয়া ভাল? আজকাল যেন প্রকৃতিও গল্প শুনাতে চায়। মৃত্যুর গল্প।

[গ]

মেসে ফিরে যেমন আনন্দ পাওয়া যাবে ভেবেছিলাম তার এক ক্ষুদ্রাংশও পাওয়া গেল না। সবার মুখে কেমন মলিন হাসি। ছয় মাস পর দেখা হওয়াটা যেন কিছুই না।

বিকেলে মেসের রুটিনমাফিক সবাই একসাথে জব্বার চাচার চা স্টলে  গেলাম।
স্টল নেই। সেখানে নতুন দোকানের কাজ চলছে। কারো কাছে জানতেও চাইলাম না জব্বার চাচা কোথায়।

পাশের স্টলে বসে পড়লাম। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পর্দা উঠেছে দিন দুই এক হবে। আজকে বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ডের খেলা। সবার হাতে কালো ব্যাজ। এক মিনিট নীরবতাও পালন করতে দেখলাম। ক্রিকেট বিশ্ব কি ভেবেছিল এতগুলো তারকা ছাড়াই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে? কোপা আমেরিকা, উয়েফা ইয়রো কিংবা অলিম্পিক গেমসেরও তো একই দশা।

ঘরে ফিরলাম সন্ধ্যার আগেই। মাগরিবের আজান হচ্ছে। ক্ষণিকের জন্য কেমন যেন একটা শান্তি অনুভূত হচ্ছে। ওয়ারড্রব খুলে জায়নামাজটা বের করলাম। দাদুর দেয়া জায়নামাজ। হজ্জ্ব থেকে ফিরে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। আহ্ জায়নামাজ জুড়ে দাদুর পরশ মিশে আছে। সেই যে হাতপাতালে ভর্তি হলেন। তারপর কোয়ারেন্টাইন আর আইসোলেশন শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হতে হতে উনার মৃত্যুর খবরটাও শুনতে হলো।

-মনে রাখিস দাদুভাই! তোর বউ না দেখে কিন্তু আমি মরব না।

কথাটা আজও কানে বাজে।নির্লজ্জের মতো বাজতেই থাকে চোখ ভেজা অবধি।

[ঘ]

ছ'মাস পর ক্লাস শুরু। কোলাহল নেই বিন্দুমাত্র। ক্লাস টপার আর ব্যাকবেঞ্চারদের একাকার হয়ে যেতে দেখলাম এই প্রথম। ক্লাসে এক মিনিট চুপ করে থাকতে না পারা ছেলেটাও গালে হাত দিয়ে এদিক ওদিক চোখ নাড়ছে। মুখ বন্ধ। হাসিটা আজকাল সোনার হরিণ। পেয়াজ কিংবা মাস্কের দামকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সহপাঠীদের কে আছে কে নেই তা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। কাউকে ঘামাতেও দেখলাম না। দু'একজন নতুন স্যার দেখা গেল পুরনোর বদলে। ব্যাপারটাগুলো সবাই খুবই স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে। যেন মৃত্যুর খবর এড়িয়ে যেতে পারলেই বাচা যায়।

ছুটির পর সজিব ডাক দিল।

-তোমার সাথে কথা আছে। একটা নাঈম ছিল না আমাদের শাখায়? পিছনে বসতো। মোটা করে?
-হ্যাঁ কোথায় ও?
-মৃত্যুর আগের দিন নাম্বার চেয়েছিল তোমার। ওর ফেসবুক আইডিতে নাকি তোমার কি একটা স্ট্যাটাস লিখে দেয়ার কথা ছিল? আমাকে পাসওয়ার্ড বলে গেছে। আমি তোমাকে বলছি। তুমি লিখে দিও।

আমার মনে পড়ল আমার পার্সোনাল ডায়েরিতে লেখা সাদাত হোসাইনের লেখা  চারটি লাইন ও পোস্ট দিবে বলেছিল।লাইন চারটি বিষকাটা হয়ে আমার অন্তরে বিধতে লাগল ততক্ষনাৎ।

" আমি একদিন নিখোঁজ হবো,উধাও হবো রাত প্রহরে,
সড়ক বাতির আবছা আলোয়,খুঁজবে না কেউ এই শহরে,"

পরিশিষ্ট:

 এক  মাস কেটে গেছে মোটামুটি। সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে অনেকটাই। আমি যাচ্ছি চট্টগ্রাম। গতকাল ফোন এসেছিল একটা।

-আসসালামু আলাইকুম। আমি তোমার ভাইয়ের বন্ধু বলছি। ইতালি থেকে ছুটিতে এসেছি দুইদিন হলো। তোমার ভাইয়ের ওয়ারড্রপের তালা ভেঙে দেখলাম সে তোমাদের জন্য জিনিসপত্র কিনেছিল কিছু। তাই জিনিসগুলা নিয়ে আসলাম। আমার বাসা চট্রগ্রাম। তোমার মা-বাবাকে নিয়ে বেড়াতে এসে নিয়ে যেও। সাথে একটা আইফোন এক্সও আছে।
Share:

No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Labels

Blog Archive

Recent Posts

Label