সেদিন বিকেলে ক্লাস থেকে বের হবার পর একটি কালো বর্ণের মেয়ে পিছু ডাকলো — "এই যে, শুনুন।" মেয়েটিকে আমি চিনি বলে মনে হয় না। তার দিকে ফিরে তাকাতেই সে বললো — "আপনি আমাকে চিনবেন না। তবে আমি আপনাকে চিনি।" আমি অনেকটা হতভম্ব হয়ে রইলাম। মেয়েটি আমাকে চিনে বাট আমি তাকে চিনি না। তারপর আবার সে আমার সাথে কথা বলতে আসলো। নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে হয়তো। আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম — "আমার ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে। আপনার কোনো জরুরি কথা থাকলে বলতে পারেন।" সে বললো তার নাকি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা নেই। আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চায়। ব্যাপার টা আমি তেমন গুরুত্ব সহকারে নিলাম না। তার কথার একটি জবাব দিয়েই আমি সেখান থেকে চলে আসলাম। সেটি হলো — "অপরিচিত কারো সাথে আমি কখনো ফ্রেন্ডশিপে জড়াই না।"
সময়ের পরিক্রমায় জানতে পারলাম সে নাকি আমার গার্লফ্রেন্ড তুম্পার সাথেও একই ব্যাপারে আলোচনা করেছে। তার ফ্রেন্ডশিপের পেছনে কোনো খারাপ মতলব আছে ভেবে তুম্পাও তার কথাকে নাকোচ করে দিয়েছে। পুরো ভার্সিটিতে সে আজ পরিচিত একজন। কিন্তু তার ঐ চেহারার কালো বর্ণের কারণে কেউ তার বন্ধু হতে চায় না।
তুম্পা আর আমি পার্কে বসে বাদাম চিবোচ্ছিলাম। ঠিক তখনই মেয়েটি একটি কালো জামা ও কালো ওড়না মাথায় দিয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হলো। তার কুচকুচে কালো বর্ণের সাথে কালো জামা দেখে মনে হচ্ছিলো যেনো সামনে একটা কালো স্তম্ভ দাড়িয়ে আছে। তাকে দেখা সত্বেও আমরা কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। কিন্তু সে আমাদের অবাক করে দিয়ে তুম্পার পাশে গিয়ে বসে পড়লো। তারপর বললো — "ভার্সিটিতে আমার দেখা প্রিয় জুটিটা হলো তুম্পা ও হাসিব। আপনাদের দুইজনকে পাশাপাশি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আর সবচেয়ে স্ট্রেঞ্জ বিষয় হলো আপনাদের দেড় বছরের রিলেশনে একবারও ঝগড়া না হওয়া। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় আপনাদের রিলেশনে থার্ড পার্সন হয়ে একটা ঝগড়া লাগিয়ে দিই। ঝগড়া না থাকলে রিলেশনের ইন্টারেসটিং ব্যাপার টা হারিয়ে যায়।"
অনেকটা মুচকি হেঁসে মেয়েটি তার কথাটি বলা শেষ করলো। কি জবাব দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি ভাবতে ভাবতেই তুম্পা হাসিমুখে মায়াবী গলায় "থ্যাংকস" বলে তার জবাব দিয়ে দিলো। অতঃপর মেয়েটি তুম্পার পিঠে হাত চোপড়ে বললো — "You are very lucky" কথাটি বলেই সে সেখান থেকে উঠে গেলো।
আমাদের দেড় বছরের রিলেশনে একবারও ঝগড়া হয় নি এ কথা টা তো সে জানার কথা নয়। কেনানা আমরা ফোনো কথা বলার সময়ও তো ঝগড়া করতে পারি। যদিও বা সে আমাদের সারাক্ষণ ফলো করে থাকে তবুও আমরা ফোনে কি কথা বলি তা সে জানার কথা নয়। আসলেই আমাদের রিলেশনে আজ পর্যন্ত একবারও ঝগড়া হয় নি।
সেদিন কথা বলে মেয়েটি অনেকটা আমাদের মন জয় করে নিয়েছিলো। তুম্পা এবং আমি মিলে ওকে আমাদের ফ্রেন্ড বানিয়ে নিলাম। খুব হাসিখুশি কাটছিলো ফ্রেন্ড সার্কেলে আমাদের আড্ডা। জানতে পারলাম তার বাবা মা কেউ নেই। কিন্তু তার অর্থসম্পদ অনেক বেশী। নিকেতনে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি আর ব্যাংকে এখনো সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা আছে। কিন্তু সে কালো বলে তার কোনো ফ্রেন্ড নেই। সে তার জীবনের কেবলমাত্র এতটুকু কথাই আমাদের সাথে শেয়ার করলো। ওর কথা শুনে আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড তিতলির কথা মনে পরে গেলো। সে যথেষ্ট সুন্দর ছিলো তবে তারও বাবা মা নেই। সে তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলো। রোড এক্সিডেন্ডে তার বাবা মা মারা যায়। তার বাবার অর্থসম্পদ ও কম ছিলো না। শুনেছিলাম ঢাকায় তিনটে বাড়ি আছে। আর ব্যাংকে যে পরিমান টাকা আছে তা দিয়ে নাকি পরবর্তী পাঁচ প্রজন্ম খেয়ে বসে কাটিয়ে দিতে পারবে।
আমাদের ভার্সিটিতে প্রতি বছর সেরা শিক্ষক/শিক্ষিকা আর সেরা শিক্ষার্থীর এওয়ার্ড দেওয়া হয়। যে শিক্ষক বা শিক্ষার্থী অলরাউন্ডার (পড়াশুনা, আচার-আচরণ, নিয়মিত ক্লাসে আসা) পারফর্মেন্সে সেরা হয়, সকল ছাত্রছাত্রী তাদের দুইজনের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এবছর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে নির্বাচিত হলো কালো বর্ণের মেয়েটি। আগে তার সাথে পরিচয় হলেও নাম জানতাম না। স্টেজ থেকে উপস্থাপক যখন বললো — "এ বছরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে - 'মুজতাবা আরেফিন তিতলি'।" ঠিক তখনই কালো মেয়েটাকে দেখলাম স্টেজের দিকে ছুটে চলছে। আমি অনেকটা অবাক হয়ে রইলাম। আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথে তার কিছু মিল খুজে পেলাম কিন্তু তিন শব্দের নামটাও যে এভাবে মিলে যাবে তা আমার কল্পনার বাইরে ছিলো।
মেয়েটি এওয়ার্ড নিয়ে দাড়িয়ে চতুর্দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কালো বলে প্রতিবছরের মতো কেউ আর তার কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে যাচ্ছে না। আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলে সে যুক্ত হয়েছে। ফ্রেন্ড হিসেবে তার মনের কষ্ট টা দূর করা আমার দায়িত্ব। আমার ওয়ালেটে দেখলাম তিন হাজার টাকা আছে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বিজ্ঞাপন দিলাম, যে ব্যক্তি তিতলির কাছ থেকে সিগনেচার আনতে যাবে তাকে একশো টাকা করে দেবো। এভাবে তিন হাজার টাকায় ত্রিশ জন যুক্ত হলো। আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তুম্পাও তার কাছে থাকা এক হাজার টাকার নোটটার পরিবর্তে আরো দশজন যোগাড় করলো। মোট চল্লিশজন যখন তিতলির কাছ থেকে সিগনেচারের জন্য লাইন লাগলো তখনই আমি তিতলির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তার মুখে হাসির ছাপটুকু যেনো তিন হাজার টাকা শোধ করে দিলো।
কিছুদিন পর সে আমাকে আর তুম্পা কে তার বাড়িতে ইনভাইট করলো। আমরা দুজন গিয়ে সর্ব প্রথম অবাক হলাম তার বাড়িটা দেখে। দুইতলা বাড়িটা মনোরম ডিজাইন করা। ভিতরের ফার্নিচারের ডিজাইনগুলো আরো মনোমুগ্ধকর। প্রত্যেকটা জিনিসই সুন্দর করে সাজানো গুছানো। মনে হচ্ছে শুধুমাত্র তার চেহারা ব্যাতিত সবকিছুই পারফ্যাক্ট। সে আমাদের জন্য প্রায় সতেরো ধরনের আইটেম রান্না করলো। সবগুলো থেকে এক লোকমা করে খেলেই যেনো পেট পুরো হাউসফুল।
খাবার দাবার শেষে সে বলতে বসলো তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাহিনীগুলো। আমাদের সাথে তার কষ্টের কথাগুলো শেয়ার করলে হয়তো তার দূঃখ অনেকটা হালকা হয়ে যাবে। সে শুরু করলো তার স্টোরি — "আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একটি ছেলের সাথে আমার রিলেশন হলো। ও আমাকে খুব ভালোবাসতো। আমিও তাকে কম ভালোবাসিনি। আমার অপরূপ চেহারা অন্যদের মুগ্ধ করতো। আমার স্কুল লাইফে আমি সাতাত্তর টি প্রেমপত্র পেয়েছি। দাড়াও দেখাচ্ছি..."
এইটুকু বলে সে প্রেমপত্রগুলো আনতে গেলো। একটু পর সবগুলো নিয়ে আসলো। সেগুলো এনে সে আমাদের কাছে রাখলো। আমি সেগুলো দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। তারপর সে আবার বলতে শুরু করলো — "দেখো অবস্থা, আমার মতো একটি মেয়ের ভালোবাসা পাবার জন্য কতগুলো ছেলে লাইন ধরে থাকতো। এই চিঠিগুলোর মধ্যে একটা স্পেশাল চিঠি আছে। ওটা আমি প্রায়ই পড়ি। ওই ছেলেটার সাথেই আমার রিলেশন হয়েছিলো। একটা মুহুর্তে যদি সে আমার ফোন অফ পেতো তাহলে দৌড়ে আমার বাসায় চলে আসতো। আর যদি কখনো ওয়েটিংয়ে পেতো তখন আমার জন্য সে কেঁদে কেঁদে সারা রাত কাটিয়ে দিতো এই কথা ভেবে যে, আমি অন্য কারো সাথে কথা বলছি। অথচ তখন আমার প্রতি তার ভালোবাসা বাড়ানোর জন্য ইচ্ছে করেই আমার বান্ধবীদের ফোন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম। সেই আমি আজ আর তেমন নেই। আর আমার ভালোবাসার মানুষটিও আজ বদলে গেছে।
||
আজ আমি কালো বলে ভার্সিটির সিনিয়র-জুনিয়র প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ের কাছে হাত জোর করে একজনও ফ্রেন্ড বানাতে পারলাম না। আমি ভেবেছিলাম আমার ২০/২৫ জন ফ্রেন্ড নিয়ে একটা সার্কেল হবে। তাদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে আমার বাড়িতে খাবারের পার্টি হবে। ড্রইং রুমে গোল চত্তর দিয়ে বসে সবাই গানের কলি খেলবো। মাঝে মাঝে একই সুরে রবীন্দ্র সংগীত গাইবো। আর ভরপুর লাঞ্চ ও ডিনারে দিনটা পার করে দেবো। কিন্তু কিছুই হলো না। একজনকে ও পেলাম না। যেই না তোমাদের দুজনকে পেলাম তাও যেনো অধরা।
||
আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন প্রাইভেট কার এক্সিডেন্টে আমার বাবা মা দুজনেই মারা যায়। দূর্ভাগ্যবশতঃ তাদের সাথে সেদিনের জার্নিতে আমি ছিলাম না। থাকলে হয়তো আমিও জীবনের শেষ সময়টা পার করে তখনই অনন্ত জীবনে পদার্পণ করতে পারতাম। তা হলো না। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, একদল বখাটে আমার গায়ে এসিড মেরে দিলো। আমি তাদেরকে চিনতাম না। কি কারনে আমার গায়ে এসিড মারলো সে তদন্ত আমি আজও করতে পারি নি। বাবা মা নেই বলে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার মতোও কেউ ছিলো না। রাস্তায় থাকা একজন ট্রাফিক পুলিশ নাকি আমাকে কোনোমতে একটি সরকারি হাসপাতালে দিয়ে তারপর চলে এসেছে। তার সাথে আজও পরিচয় হলো না। এসিডে আমার পুরো চেহারা নষ্ট হয়ে গেলো। আমি আমার সেই ভালোবাসার মানুষটিকে অনেকবার ডেকেছি কিন্তু সে আমার চেহারার দিকে তাকালেই ভয় পেয়ে যেতো। যে আমার সাথে প্রায় তিন বছরের রিলেশনে একবারও একটি মাত্র কটু কথা বলে নি, সে সেদিন আমাকে সরাসরি বলে দিলো, আমার চেহারা দেখলে নাকি হিংস্র কোনো জন্তুর মতো মনে হয়। সে নাকি আমাকে আর সহ্য করতে পারে না।
||
আমি গেলাম সিঙ্গাপুর চেহারা ঠিক করার জন্য। সিদ্ধান্ত নিলাম আমার মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করবো। ডাক্তাররা যখন আমাকে আমার ছবি দেবার জন্য বললো ঠিক তখনই আমি দিলাম এক আফ্রিকান নিগ্রো মেয়ের ছবি। বললাম পারলে এর চেয়েও একটু বেশী কালো করে দিতে। তারা আমার কথামতো তাই করলো। মাসখানি পর কুচকুচে কালো বর্ণের প্লাস্টিক সার্জারি করা চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম দেশে। দেশে এসেই জানতে পারলাম সে নাকি অন্য একটি মেয়ের সাথে রিলেশনে জড়িয়েছে। চোখের সামনে তাদের ভালোবাসা দেখে যাই। আমার কোনো কাজকর্ম নেই। সারাক্ষণ ওদের পেছনে লেগে থাকি। ওদের পরম ভালোবাসায় আমার হৃদয়ে এক ঝাক কষ্ট বেধে নিই।
||
আত্মহত্যা মহাপাপ। নতুবা অনেক আগেই আমি এই কাজটা করে ফেলতাম। কিন্তু আল্লাহ আমাকে সেই কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। ব্লাড ক্যান্সার আর ব্রেইন টিউমার দুইটা রোগই আমায় একসাথে আঘাত করছে। এক মাস আগে ডাক্তার বলেছিলো আমি আর বড়জোর একমাস বাঁচবো। ডাক্তারের দেয়া ডেইট টা কালকে পার হয়ে গেছে। আজকের টা বলা যায় ওভারটাইম অথবা বোনাস। অতি শীঘ্রই আমি পরকালে যাতায়ত করবো। আজ, কাল নতুবা পরশু, খুব শীঘ্রই আমি চলে যাচ্ছি। শেষ সময়ে আনন্দ এতটুকুই যে তোমাদের মতো দুইজন ভালো বন্ধু পেয়েছি। যারা আমাকে খুশি করার জন্য চার হাজার টাকা দিয়ে চল্লিশজন মিথ্যে মানুষ যোগাড় করে শুধুমাত্র একটা অটোগ্রাফের জন্য। সত্যি তোমাদের মন মানসিকতা খুবই ভালো। আমার জন্য শুধুমাত্র একটু কষ্ট করো। মৃত্যুর পর আমার দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে দিও। আমার বাড়ির পাশেই বাবা-মায়ের কবর। বাবা আর মায়ের কবরের মাঝখানে একটু ব্যবধান রেখে দিয়েছি। ওই মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় ই আমাকে শুইয়ে দিও তোমরা।"
তিতলির গল্প শোনার পর আজ বড় একজন অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। ইচ্ছে হচ্ছে পরম ভালোবাসায় তাকে একটিবার জড়িয়ে ধরে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলি যে, আমাকে ক্ষমা করে দাও। তার সামনে বসে নিজের অপরাধগুলোর কথা শুনে আমার হৃদয় স্তব্ধ হয়ে গেলো। যাকে নিয়ে তিনটি বছরে হাজারটি স্বপ্ন গড়েছিলাম সে আজ চোখের সামনে দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যাবে অনন্তকালের জন্য। কিন্তু তার জন্য কিছু করতে পারছি না। জানিনা কোনোদিন এর ক্ষমা হবে কি না। পাশে তাকিয়ে দেখলাম তুম্পার চোখে পানি। আমারো চোখ দুটো ভিজে গেছে। অপরাধীর মতো যখনই ভেজা চোখ নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম তখনই কালো বর্ণের দুটো হাত আমাদের দুজনের গালে স্পর্শ করে মুছে দিলো ভেজা অংশটুকু।
গল্পঃ যাত্রা শেষে।
||
আজ আমি কালো বলে ভার্সিটির সিনিয়র-জুনিয়র প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ের কাছে হাত জোর করে একজনও ফ্রেন্ড বানাতে পারলাম না। আমি ভেবেছিলাম আমার ২০/২৫ জন ফ্রেন্ড নিয়ে একটা সার্কেল হবে। তাদের নিয়ে প্রতি সপ্তাহে আমার বাড়িতে খাবারের পার্টি হবে। ড্রইং রুমে গোল চত্তর দিয়ে বসে সবাই গানের কলি খেলবো। মাঝে মাঝে একই সুরে রবীন্দ্র সংগীত গাইবো। আর ভরপুর লাঞ্চ ও ডিনারে দিনটা পার করে দেবো। কিন্তু কিছুই হলো না। একজনকে ও পেলাম না। যেই না তোমাদের দুজনকে পেলাম তাও যেনো অধরা।
||
আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন প্রাইভেট কার এক্সিডেন্টে আমার বাবা মা দুজনেই মারা যায়। দূর্ভাগ্যবশতঃ তাদের সাথে সেদিনের জার্নিতে আমি ছিলাম না। থাকলে হয়তো আমিও জীবনের শেষ সময়টা পার করে তখনই অনন্ত জীবনে পদার্পণ করতে পারতাম। তা হলো না। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, একদল বখাটে আমার গায়ে এসিড মেরে দিলো। আমি তাদেরকে চিনতাম না। কি কারনে আমার গায়ে এসিড মারলো সে তদন্ত আমি আজও করতে পারি নি। বাবা মা নেই বলে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার মতোও কেউ ছিলো না। রাস্তায় থাকা একজন ট্রাফিক পুলিশ নাকি আমাকে কোনোমতে একটি সরকারি হাসপাতালে দিয়ে তারপর চলে এসেছে। তার সাথে আজও পরিচয় হলো না। এসিডে আমার পুরো চেহারা নষ্ট হয়ে গেলো। আমি আমার সেই ভালোবাসার মানুষটিকে অনেকবার ডেকেছি কিন্তু সে আমার চেহারার দিকে তাকালেই ভয় পেয়ে যেতো। যে আমার সাথে প্রায় তিন বছরের রিলেশনে একবারও একটি মাত্র কটু কথা বলে নি, সে সেদিন আমাকে সরাসরি বলে দিলো, আমার চেহারা দেখলে নাকি হিংস্র কোনো জন্তুর মতো মনে হয়। সে নাকি আমাকে আর সহ্য করতে পারে না।
||
আমি গেলাম সিঙ্গাপুর চেহারা ঠিক করার জন্য। সিদ্ধান্ত নিলাম আমার মুখে প্লাস্টিক সার্জারি করবো। ডাক্তাররা যখন আমাকে আমার ছবি দেবার জন্য বললো ঠিক তখনই আমি দিলাম এক আফ্রিকান নিগ্রো মেয়ের ছবি। বললাম পারলে এর চেয়েও একটু বেশী কালো করে দিতে। তারা আমার কথামতো তাই করলো। মাসখানি পর কুচকুচে কালো বর্ণের প্লাস্টিক সার্জারি করা চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম দেশে। দেশে এসেই জানতে পারলাম সে নাকি অন্য একটি মেয়ের সাথে রিলেশনে জড়িয়েছে। চোখের সামনে তাদের ভালোবাসা দেখে যাই। আমার কোনো কাজকর্ম নেই। সারাক্ষণ ওদের পেছনে লেগে থাকি। ওদের পরম ভালোবাসায় আমার হৃদয়ে এক ঝাক কষ্ট বেধে নিই।
||
আত্মহত্যা মহাপাপ। নতুবা অনেক আগেই আমি এই কাজটা করে ফেলতাম। কিন্তু আল্লাহ আমাকে সেই কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। ব্লাড ক্যান্সার আর ব্রেইন টিউমার দুইটা রোগই আমায় একসাথে আঘাত করছে। এক মাস আগে ডাক্তার বলেছিলো আমি আর বড়জোর একমাস বাঁচবো। ডাক্তারের দেয়া ডেইট টা কালকে পার হয়ে গেছে। আজকের টা বলা যায় ওভারটাইম অথবা বোনাস। অতি শীঘ্রই আমি পরকালে যাতায়ত করবো। আজ, কাল নতুবা পরশু, খুব শীঘ্রই আমি চলে যাচ্ছি। শেষ সময়ে আনন্দ এতটুকুই যে তোমাদের মতো দুইজন ভালো বন্ধু পেয়েছি। যারা আমাকে খুশি করার জন্য চার হাজার টাকা দিয়ে চল্লিশজন মিথ্যে মানুষ যোগাড় করে শুধুমাত্র একটা অটোগ্রাফের জন্য। সত্যি তোমাদের মন মানসিকতা খুবই ভালো। আমার জন্য শুধুমাত্র একটু কষ্ট করো। মৃত্যুর পর আমার দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে দিও। আমার বাড়ির পাশেই বাবা-মায়ের কবর। বাবা আর মায়ের কবরের মাঝখানে একটু ব্যবধান রেখে দিয়েছি। ওই মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় ই আমাকে শুইয়ে দিও তোমরা।"






No comments:
Post a Comment