লেখক: সাকিব মাহমুদ
আমি আকাশ, খুবই গরীব পরিবার থেকে বড় হয়েছি আমি। ছোট বেলায় বাবা মারা যান, এরপর থেকেই আমাদের পরিবারের অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। আমার মা আমাকে অতি কষ্ট করে বড় করেছে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছে।
আমি এখন অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। এস এস সির পর থেকে আম্মুর কষ্ট একটু কমানোর উদ্দেশে ২-৩ টা টিউশন করতাম। সেখান থেকে যা টাকা পেতাম, তা দিয়েই আমার পড়ালেখা কোনোভাবে চলে যেতো।
যাই হোক, অনেক কষ্টের কথা বলা হলো, এখন আসি আসল গল্পে। মায়ের সাথে এখন আছি গ্রামে, আমার মায়ের আবদার, তার ছেলের বউ লাগবে। বাড়িতে একা একা বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না ।
তবে এখন আমার বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। বিয়ে করে বউকে খাওয়াবো কি? মা ছেলের কোনোভাবে চলে যায়, এর মধ্যে আবার অন্য একটা মেয়ে কে কিভাবে আনবো?
তবে মায়ের জেদের কাছে হার মানতে হলো আমাকে। অবশেষে রাজি হলাম মায়ের প্রস্তাবে। তবে আমার বিয়ে কোনো বড় আয়োজন করে হবে না।
আমাদের এখানে একটা সংস্থার পক্ষ থেকে গরীব ছেলে মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আমার বিয়েটা সেখানেই হবে।
মেয়ের ছবি দেয়া হয়েছিল। তবে আমি দেখার প্রয়োজন মনে করিনি । আমার মা দেখেছে, এতেই অনেক ।
যাই হোক। সময় মতো বিয়ে হয়ে গেলো। তবে বিপত্তি ঘটলো বউ আনার সময়। গিয়ে দেখি আমার বউ নেই। বিষয় টা কি হলো? বুঝতে পারলাম না।
পরে ওখানের লোকেরা বললো আমার বউকে নাকি চলে যেতে দেখেছে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো, বিয়ে করে সারতে পারলাম না, আর বউ আমার পালিয়ে গেলো?
আমি ওখান থেকে মিয়ের ঠিকানা নিয়ে চলে গেলাম মেঁয়ের বাড়িতে। তবে সেখানে গিয়ে দেখি, যে মিয়ের সাথে বিয়ের কথা ছিল, তার বাবা মারা গেছে, সে বিয়ে করতেই আসেনি।
তাহলে আমার বিয়ে হলো কার সাথে? অনেক ভাবনা চিন্তা করে মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।
চলে গেলাম বিয়ের আসরে । সেখানে আমার বিয়ের ছবি টা পেলাম। ছবি তে মেয়ে টাকে ভালো ভাবেই দেখা যাচ্ছে। ছবি টা নিয়ে চলে গেলাম বাস স্টেশনে। একের পর পর এক মানুষকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। কেউ দেখেছে কিনা!
অবশেষে খোজ পেলাম। মেয়েটি ঢাকার বাস ধরে ঢাকা মহাখালী পর্যন্ত গেছে। কিছু না ভেবে আমিও চলে আসলাম ঢাকায়।
তবে আমি এখন ওকে খুঁজে পাবো কিভাবে? এতো বড় শহরে তাকে পাওয়া টা তো প্রায় অসম্ভব ।
পকেটে বেশি টাকা ও নেই, রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। এমন সময় দেখলাম একটা গাড়ি রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে পড়লো। কৌতূহলের আবেশে গিয়ে দেখি একজন লোক, স্তেয়ারিং এ মাথা দিয়ে কাতরাচ্ছে। মনে হলো অসুস্থ। পরে বুঝতে পারলাম, তার অবস্থা ভালো না।
তাই, তাকে পাশের একটা হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললো ওনার হার্ট এটাক হয়েছে। একটুর জন্য বেঁচে গেছেন উনি।
তবে জ্ঞ্যান ফিরতে সময় লাগবে।
দায়িত্ববোধ থেকেই ওখানে থেকে গেলাম। রাত হয়ে গেলো, সারাদিন না খাওয়া। শরীল অনেক টাই দুর্বল। পরে কেন্টিন থেকে হালকা কিছু খেয়ে রাত টা ওখানেই পার করে দিলাম।
পরের দিন সকালে লোক টার জ্ঞ্যান ফিরলো। উনি আমাকে দেখে খুবই খুশি হলো। আমার দায়িত্ববোধ দেখে তার ভালো লাগলো।
লোকটা আমাকে আমার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলো। কারণ আমি বিয়ের পোশাক পরেই আছি। এরপর তাকে সব কথা বললাম। তিনি আমার সকল কথা শুনে বললেন, তিনি আমাকে সাহায্য করবেন। আমি তার বাড়িতে থেকেই আমার বউ এর খোজ করতে পারি।
এখানে এখন থাকার মতো কোনো জায়গায় নেই আমার। তাই অনেক টা বাধ্য হয়েই রাজি হয়ে গেলাম আমি।
তার সাথে অবশেষে আমি তার বাড়িতে গেলাম। তিনি অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ।
তার পরিবারে তিনি আর তার স্ত্রী ছাড়া কেউ নেই। তাদের কোনো সন্তান নেই। অনেক বড় বাড়ি ঢাকার বুকে। মনে হয় অনেক বড়লোক।
আমি: আচ্ছা আঙ্কেল, দেখলাম আপনার কোনো সন্তান নেই!!
আঙ্কেল: হ্যাঁ বাবা। তবে আমার একটা ছেলে ছিলো। রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছে।
আমি: I am sorry আঙ্কেল....
আঙ্কেল: It's ok। তুমি এখন রেস্ট নাও, আমার গিন্নি তোমার খাবার ব্যবস্থা করছে।
আমি: জি আঙ্কেল, আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো!!
আঙ্কেল: তোমার জন্যই আমার জীবন টা আছে। আর তোমার জন্য এইটুকু করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো। আর তুমি তো আমার ছেলের মতোই, আমার ছেলে হলে কি আমি এইটুকু করতাম না?
আমি: জি আঙ্কেল, অনেক ধন্যবাদ...
আঙ্কেল: বাবা, তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে নাও তো....
আমি ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। এরপর ঢাকার রাস্তায় খুঁজতে লাগলাম আমার বউকে। জানিনা কোথায় আছে.... শুধু জানি, আমার মায়ের জন্য তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
৩ দিন পর....
আমি রাস্তায় রাস্তায় মেয়েটার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছিলাম। হঠাৎ করেই একটা গাড়ি খুব জোড়ে যাওয়ার সময় আমার শরীল কাদা ছিটিয়ে দিয়ে গেলো...
আমি: এই, কানা নাকি!?? ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে পারেন না?
গাড়িটা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। এরপর গারির কাঁচ নামিয়ে একটা মেয়ে বললো, সরি।।।।।।
সরি বলেই আবার চলে গেলো...
আমি হঠাৎ দেখলাম ,,, আরে এই তো সেই মেয়েটি, জার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি দৌড়ে গাড়ির পিছু পিছু যেতে লাগলাম।
তবে গাড়ির সাথে তো মানুষ পারে না। তাই আমি গাড়ির নাম্বার টা দেখে নিলাম ভালো করে। গাড়িটা নিমিষেই চলে গেলো....
আমার একটা বন্ধু আবার RTO তে চাকরি করে। এরপর তাকে ফোন দিলাম।
আমি: হেলো, সুমন....
সুমন: হ্যাঁ বন্ধু। এতদিন পর? কি মনে করে? কেমন আছিস?
আমি: ভালো আছি বন্ধু।... তোর একটা হেল্প লাগবে আমার। না করতে পারবিনা কিন্তু!!!
সুমন: বল, কি হেল্প? পারলে অবশ্যই করবো।
আমি: দোস্ত, আমি একটা গাড়ির নাম্বার দিচ্ছি, ওই গাড়িটা কার? তার ঠিকানা টা একটু দিতে হবে আমাকে।
সুমন: দোস্ত, এইটা তো সম্ভব না। এইসব তথ্য তো কাউকে দেওয়া যায়না।
আমি: দোস্ত, আমি সেটা জানি। কিন্তু আমি খুব সমস্যায় পরছি। প্লিজ বন্ধু... ( এরপর ওকে সব বললাম)
সুমন: ঠিক আছে বন্ধু। এইটা যদিও অন্যায়, তবুও আমি তোকে এই সাহায্য টা করবো। তবে আমাদের এখানে থেকে যে তথ্য পেয়েছিস, সেটা বলা যাবে না। তাহলে আমি সমস্যায় পরে যাবো।
আমি: আরে না, তুই আমাকে সাহায্য করছিস, এটাই অনেক। আমি কোনোদিন এইটা কোথাও শেয়ার করবো না।
সুমন: ঠিক আছে । ফোনে বলা টা ঠিক হবে না। আমি তোকে সব ডিটেলস মেসেজ করে দিচ্ছি....
আমি: ধন্যবাদ দোস্ত....
কিছুক্ষণ পরেই সুমনের মেসেজ আসলো। সেখানে নাম ঠিকানা দেওয়া আছে।
মেসেজের পরেই সুমনের ফোন আসলো।
আমি: হ্যাঁ দোস্ত, অনেক ধন্যবাদ।
সুমন: হুম, তবে নাম্বার টা জানিস? কার?
আমি: কার?
সুমন: এই এলাকার এমপির মেয়ে। তাই একটু সাবধানে। আর লোকটাও বেশি ভালো না।
আমি: ঠিক আছে, আমি তোর কথা মাথায় রাখবো।
সুমন: আচ্ছা দোস্ত, ভালো থাকিস।
আমি: ওকে দোস্ত। আল্লাহ হাফেজ।
মেসেজের ঠিকানা অনুযায়ী চলে গেলাম বাসায়। সেখানে যাওয়ার সাথে সাথেই দাড়োয়ান আটকে দিলো আমাকে। অনেক জোরাজুরি করার পর আমাকে ঢুকতে দিলো, বাড়ির ভিতরে।
বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার বউ আর তার বাবা মা একসাথে বসে কি নিয়ে যেনো আলোচনা করছিলো।
এমপি: এই ছেলে? কে তুমি?
আমি: জি, আমি আকাশ....
এমপি: হ্যাঁ, আমার এখানে কেনো? কি দরকার? এইদিকে এসো....
আমি এগিয়ে গেলাম।
এমপি: তোমার কি দরকার? পরে এসো এখন একটু জরুরি আলোচনা করছি।
আমি: আমার দরকার আপনার কাছে না।
এমপি: তাহলে?
আমি: আমার দরকার আপনার মেয়ের কাছে।
এমপি: আমার মেয়ের কাছে? তার কাছে কি দরকার তোমার?
আমি: আমার সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। সে আমার বিবাহিতা স্ত্রী।
এরমধ্যেই আমার বউ এগিয়ে আসলো....
এমপি: মা রানী... দেখতো ওকে চিনিস কিনা?
রানী: না বাবা। আমিতো চিনিনা... কে উনি?
এমপি: তোর নাকি ওর সাথে বিয়ে হয়েছে?
আমি: জি, ওনার সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে। আমার বউকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি।
এমপি: নিয়ে যেতে এসেছি মানে? এই, তোমার কোনো ধারণা আছে? তুমি কোথায় দাড়িয়ে কথা বলছো?
আমি: জি, জানি। তবে উনি আমার বিয়ে করা বউ। উনাকে না নিয়ে আমি যাবো না।
এমপি: কি প্রমাণ আছে? ও তোমার বউ?
আমি: জি, বিয়ের ছবি আছে আমার কাছে।
এরপর সব ছবি দেখলাম। রানী, মানে আমার বউও তখন স্বীকার করলো, যে আমার সাথে তার বিয়ে হয়েছে।
এরপর জানতে পারলাম যে এই মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের দিন মেয়ে পালিয়ে গেছে, আর তখনই ওর বাবার লোকদের থেকে লুকানোর জন্য বিয়ের আসরে গিয়ে পৌছায়। আর আমার সাথে বিয়ে হয়ে যায়।
সবকিছু শুনে এমপি মানে আমার শ্বশুর .... আমাকে বললো
এমপি: তোমার যতো টাকা লাগে, তুমি নিয়ে যাও। তবে আমার মেয়েকে এখান থেকেই ভুলে যেতে হবে।
আমি: সম্ভব না। আমার মায়ের জন্য আমি বিয়ে করেছি। আমার মায়ের ছেলের বউকে নিয়েই আমি বাড়ি ফিরবো।
এমপি: আর একবার এই কথা বললে তোমাকে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবো।
আমি: কেনো? আমি আমার বউকে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনি আমাকে আটকাতে পারেন না।
তবে আমাকে সরাসরি না করে দিলো, তার মিয়েকে আমার সাথে পাঠাবে না। তবে রানী, মানে আমার বউ বললো আমার সাথে যাবে, তবে মাত্র কিছুদিনের জন্য। আমার জন্য না, আমার মায়ের জন্য যাবে।
কোনো উপায় না পেয়ে মায়ের কথা চিন্তা করে ওদের কথাতেই রাজি হলাম। তবে আমার শশুর তার মেয়ে কে বললো, ওকে আমার ওখানে থাকতে দিবেনা। জোর করে নিয়ে আসবে।
যাই হোক...
আমার বউ কে নিয়ে অবশেষে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম...
বাকিটা পরবর্তী পর্বে শেষ করার চেষ্টা করবো। কেমন লাগলো, জানাবেন!






No comments:
Post a Comment