বউ নিয়ে বাজি
লেখক মোঃ কামরুল হাসান
১ম পর্ব
সত্যি তো তোমার বউ আমারে দিয়ে দিবা? হ্যা সত্যি নাকি মিথ্যা বলছি! তাহলে বাজি কিন্তু হয়ে গেল।আরে কাজটা তুই আগে করে দেখা?
এই তোমরা সকলে কিন্তু সাক্ষী রইলা। জমায়েত হওয়া লোকজন বললো, হ্যা! হ্যা! আমরা সবাই সাক্ষী তুই করে দেখা বেটা দেখি তোর কত জোর!
এতবড় কান্ড দেখতে পুকুর পাড়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল মূহুর্তের মধ্যে!
তবে, পাঠকদের সুবিধার জন্য প্রথম থেকে শুরু করি। এই গাঁয়ের রিকশা চালক মফিজ মিয়া খুব সকালে উঠে দাঁত মাজতে,মাজতে পকুড় পাড়ে এলো। হাত মুখ ধোঁয়ার জন্য যেই পানিতে তার হাতখানা ডুবিয়েছে, তার মনে হলো সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো দাঁত দাঁতের সাথে ঠুকে যাচ্ছে! হাড়ের ভিত্তি সহ নড়ে যাচ্ছে। নাহ্ কোন ভাবেই সে এই পানি দিয়ে হাত মুখ ধৌত করতে পারবে না!
সহসা তার মনে হলো এখন এই পানি দিয়ে কারো পক্ষে গোছল করা সম্ভব নয়! সে যতো বড় পালোয়ানই হোক না কেন? এমনিতেই খুব ভোর, দিনের অন্য ভাগের চেয়ে এই সময় প্রকৃতি তুলনামূলক ভাবে ঠান্ডা থাকে।
তার উপর শীতের মধ্য ভাগ চারিদিকে কিছুই ভালো মতো দেখা যাচ্ছে না!কুয়াশার হিমেল সাদা চাদরে ঢেকে গেছে সমস্ত গ্রাম! আর গ্রামের মধ্যে শীত তার প্রতাপ তুলনামূলক ভাবে বেশি ছড়ায়। এসব ভেবে মফিজ মিয়ার মনে হলো কারো পক্ষে এখন গোছল করা সম্ভব নয়! এমন সময় গাঁয়ের সবচেয়ে বদের হাড্ডি দুদু মিয়া হাত মুখ ধোঁয়ার জন্য এলো।তারও একি হাল! সে মফিজকে দেখে বলে, কি ভীষণ শীত পড়ছে মফিজ ভাই!
তুমি হাতমুখ ধুয়ে নিয়েছ? মফিজ বলে,নারে দুদু শিতে কেঁপে উঠছি! হ্যা ভাই আমারও একই অবস্থা এবার শীত একটু বেশীই পড়ছে কি কও মফিজ ভাই? হ্যা সেটা কি আর বলতে।জানিস দুদু আমার মনে হয় এই পানিতে কেউ পঞ্চাশটা ডুব দিলে তাকে আর বাঁচানো যাবে না।
দুদু বলে, না মফিজ ভাই, এইটা তুমি একটু বেশী বললা। একশো ডুব তো আমিই দিতে পারবো। মফিজ রেগে উঠে বলে, শোন দুদু তোর চাপাবাজী আমার সামনে মারিস না! যা অন্য কারো সামনে গিয়ে মার। তুমি কিন্তু মফিজ ভাই আমারে অপমান করতাছ। মফিজ ব্যঙ্গ করে বলে, আহারে আমার মান ওয়ালা , কথা কাজের ঠিক নাই তার আবার মান! তোর মান সম্মান থাকলে তো তোরে অপমান করুম। কি কইলা আমার মান নাই! কথা কাজের ঠিক নাই!
আচ্ছা কও একশো ডুব দিলে আমারে কি দিবা? মফিজ ভাবে এটা যে ত্যাদরের হাড্ডি একশো ডুবে বাজি সে হেরেও বসতে পারে।তাই বললো,তবে তো তুই তিনশো ডুবও দিতে পারবি? চেষ্টা করলে পারতেও পারি! তুমি এমন কি দিবা যে তিনশো ডুব দিতে হবে?
আরও দুয়েক জন হাতমুখ ধুতে এসে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো,মফিজ বুঝতে পারলো আজকের শীতটা যে খুব বেশি তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাতে তার বাজি ধরার ইচ্ছেটা প্রবল হলো। সে তাদের কে ডেকে দুদুরে দেখিয়ে বললো, দেখ মিয়ারা। দুদু বলে এই শীতে ও নাকি ৩০০ ডুব দিতে পারবে!
দুই জন দুদুর দিকে তাকিয়ে বলে,এই সব জায়গায় চাপা মারিসনা " তুই পঞ্চাশ ডুব দিতেই ফুট্টুস হয়ে যাবি।দুদুর জিদ চেপে গেল রাগে বললো,ও মিয়ারা একটু কম কথা কও! আমি পারমু না পারুম সেটা আমার ব্যপার। মফিজ ভাই বাজি ধরতে যখন চায় জিজ্ঞেস করো আমি জিতে গেলে কি দিবো? মমিজ নিজে থেকেই বলে, তুই যা চাইবি তাই দিমু! দুদু হেসে বললো,মফিজ ভাই এমন ভাবে বললা, মনে হয় তুমি রাজা মহারাজা! কতকিছু আছে তোমার যে আমি চাইতে দিতে পারবে।
চালাও তো মিয়া রিকশা! আবার বড় গপ্প মারো আর আমারে কও আমি চাপাবাজ। সে গর্বের সঙ্গে বলে, এই দুদু যা বলে,তা করে দেখায়! এই দুদু মুখ সামলে কথা বলবি, আমি গপ্প মারি? তাই তো মারছো। মফিজ বলে আচ্ছা তুই যদি বাজি জিততে পারিস আমার যা আছে তার থেকে যা চাইবি আমি দিয়ে দিমু!
দুদু বলে, সেই তো তোমার থাকার মধ্যে আছে একটা ছোট্ট ঘর,একটা রিকশা, আর সুন্দর একটা বউ এই নিয়ে এতো বারাবাড়ি।
অন্য দুইজন ওদের কথা শুনে বলে, এই তোরা দুইজন বাজি ধরবি তোদের সার্মথ্য অনুযায়ী। এখানে রাজা মহারাজার কথা আসছে কেন? আসল কথা দুদু তুই ভয় পাইছস! তাই তাল বাহানা করে পালিয়ে যাবার মতলব আটছিস। মুটেও না! মুটেও না!এই দুদু ভয়ে কুঁকড়ে পালিয়ে যাবার পাত্র নয়! তোমরা ভালো করেই তা জানো।
সবাই মফিজের দিকে তাকিয়ে বলে, এই শীতে তিনশো ডুব তো আর চাট্টিখানি কথা নয় এখন বল তুমি তোমার এই তিন সম্পদের মধ্যে কোনটা বাজি ধরতে রাজি?
মফিজ বললো, রিকশা চালিয়ে আমি খাই ওটাই আমার কাছে বেশি দামী ওটাই আমি বাজি ধরতে রাজি আছি। দুদু কি বল? আমি রাজি না! আমি রিকশা দিয়ে কি করবো?
এটার জন্য এত বড়ো বিপদের মধ্যে আমি যাইতে রাজি না! মফিজ সহ সকলে বলে, যা ছেমড়া! শুধু কথার ফুলঝুরি কাজের বেলায় কিছুই না! দুদু চটে উঠে বলে,এই সেই কখন থেকে দেখছি মফিজ ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে আমারে শুধু অপমান করছো। ঘটনা কি?
বাকি দুইজন এই কথায় কিছুটা দমে গিয়ে বলে, জানি কাজটা করা সহজ নয়! তাই এমন করে বলছি,তুই আর মফিজ দুজনেই আমাদের নিকট সমান কারো পক্ষ আমারা নেই নি! দুদু একটু গর্বের সাথে বলে,তোমাদের কাছে যেটা কঠিন সেটা আমার কাছে সহজ হতে পারে? তবে করে দেখা!
এই রিকশা দিয়ে হবে না। বল মফিজ ভাইরে বুকের পাটা থাকলে তার বউটা বাজি ধরতে। কি বললি ছেমড়া? এটা কি রকম কথা। কেন কাজটা কি কম কঠিন?
মফিজের রাগ উঠে গেছে সে বলে, যা ধরলাম বাজি! কিন্তু শর্ত হইলো ডুব দিতে হবে চারশো আর তুই হারলে টাকা দিবি বিশ হাজার কারণ তোর তো বউ নাই। মফিজ মনে মনে বলে,শালারে আজ উচিৎ শিক্ষা দিমু! পঞ্চাশ ডুব দিতেই শালা লুটিয়ে পড়বে আবার পালোয়ান গিরি দেখাচ্ছে!
তখন বাকি দুইজন বললো দুদু বাজি কিন্তু হয়ে গেল? দুদু বলে আমি রাজি। দুদুর রাজি হওয়ার কারণ মফিজের বউটারে তার ভীষণ ভালো লাগে! তাই জীবন দিয়ে হলেও আজ এই সুযোগ সে হাত ছাড়া করবেনা!
যেই কথা সেই কাজ বাজি চুড়ান্ত। দুদু লুঙ্গি কাছা মেরে শরীরে কয়েক দফা সরিষার তেল মালিশ করে নেমে পড়লো বরফ শীতল কনকনে ঠান্ডা পানিতে! এক,দুই, তিন, সবাই গুনে যাচ্ছে।
একে একে লোক জমায়েত হতে থাকে এভাবে এক সময় পুকুর পারে তিল ধারনের ঠাই নাই। এর মধ্যে পঞ্চাশ ডুব হয়ে গেছে আরও সাড়ে তিনশো ডুব বাকী!
অনেকে বলছে কাঠির মতো শরীর হলে কি হবে দুদুর শক্তি আছে নয়লে এখন পর্যন্ত কাহিল হওয়ার নামই নেই! মফিজ নিশ্চিত হয়ে বসে আছে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে। কিছুতেই করতে পারবেনা দুদু এই কাজ! এমন করে একশো ডুব শেষ হয়ে গেল।
মফিজ একটু নড়েচড়ে বসলো।মনে মনে ভাবছে শালার দেখি তেজ আছে। এখনো উঠার নাম নেই"
এভাবে গুনতে গুনতে একসময় একশো পঞ্চাশ পার হয়ে গেল। তখন আশেপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো এই ঘটনার কথা।আর দলেদলে লোক এক নজর তামশা দেখার জন্য উৎসাহ ভরে আসতে লাগলো!
এদিকে একশো পঞ্চাশ এর পর দুদুর ডুবের গতি কমে এলো আর মফিজের দুঃশ্চিন্তা ভারতে লাগলো। আর গাঁয়ের লোকজন এর উৎসাহ উদ্দীপনা বাড়তে লাগলো। কেউ কেউ শ্লোগান তুলে দুদু ভাই তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে।
এরকম করে দুইশো ডুব শেষ হয়ে গেল। এবার দুদুর অবস্থা খুব ভালো নয়! তার এক ডুব এক মিনিট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বললো, দুদু না পারলে উঠে আয়। মরবি তো পরে, উঠে আয় বাপ বললো, একজন বয়ষ্ক লোক। দুদু কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দেয়, তুমি যাও চাচা! আমার কিছু হবেনা তুমি বাড়ি যাও!
মফিজ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, এতো আস্তে ডুব দিলে হবেনা! সবাই তারে ধমকে বসালো। ডুব দেওয়াই কথা আস্তে আর দ্রুত কোন কথা নয়। মফিজ এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না! তার মন চাচ্ছে এখনই এখান থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু গাঁয়ের লোক তাকে ছাড়বে না।
এখন সে কি করবে শালার দুদু যে দুইশ বিশের ঘর পার করে দিয়েছে। আর একশো আশি!
মফিজের নতুন বউ দিলরুবা রান্না করছে আর মনের আনন্দে গান গাইছে। এমন সময় পাশের বাড়ির রোজিনা এসে বললো, ভাবীর দেখি আনন্দ আর ধরেনা? দিলরুবা বলে,কে গো ননদিনী তোমার মনে বুজি সুখ নাই? তা কই পুড়াইলা ? এই প্রাণ, শরীর ভরা যৌবন!
ভাবী ইয়ার্কি করার সময় এইটা না! কেন গো মনে সুখ নাই বড়ো দুঃখ? রোজিনা বলে,আমার না তোমার পোড়াকপালি! এখন যেনো দিলরুবার হুঁশ হলো, রজিনা জরুরি কিছু বলতে আইছে। কি রে রজিনা? তোমার কপাল ভাঙছে। তোর মফিজ ভাই কই? তার কিছু হয় নাই তো?
তার কিছু হয় নাই, হবে তোমার! কেন কি করছে সে? রোজিনা পাল্টা প্রশ্ন করে,কি করে নাই কও? পুকুর পারে বইসা দোস্তদের সাথে বাজি ধরছে তোমারে নিয়া, যদি দুদু চারশো ডুব দিতে পারে ঠান্ডা পানিতে তবে তোমারে তার ঘর করতে হবে। কী!" দিলরুবার মাথায় কেউ যেনো বড় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে! সে আর কিছু না বলে,শুধু বললো রোজিনা এখন আমি কি করি? তুই আমারে বল?
রোজিনা বলে পালাও ভাবী পালাও! নয়লে গাঁয়ের লোকজন একটা কিছু করে বসতে পারে। যেই কথা সেই কাজ! দিলরুবা কোন মতে কয়েকটি কাপড় পুঁটলিতে ভরে পালিয়ে পায়ে হেঁটেই বাপের বাড়ি রওনা দিলো। যাবার সময় রোজিনারে বলে গেল তুই কিছু বসিলনা বইন!
এদিকে তিনশো ডুব শেষ হয়ে গেছে। মফিজ মাথায় হাত দিয়ে বসে কোথায় যেনো মুঢ়ের মতো তাকিয়ে আছে!
চলবে,,,,






No comments:
Post a Comment